ঢাকা ০৬:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০২৪, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

নৌকা বাইচের অপরাধে পিতার বদ’দোয়া অবশেষে ১৮তম পুত্রের মৃত্যু!

অজানা ইতিহাস
এম আবুল হাশেম বিএসসি
________________________

ভূমিকাঃ

এ পৃথিবীতে কত মানুষ আসে আবার চলে যায়, কে কার খোঁজ রাখে। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যারা চলে গেলে ও তাঁদেরকে ভুলা যায় না। তাঁদের স্মৃতি কর্মজীবন ও অবদান ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকে।
পৃথিবীর বুকে মানুষের আগমন ও প্রস্তান তথা জীবন-মরণ অনস্বীকার্য একটি বিষয়, এটা জগতের চিরন্তন ধারা, কোটি কোটি মানুষ জন্ম নিচ্ছে তেমনি পৃথিবী থেকে বিদায়ও গ্রহণ করছে এতে যেমন পৃথিবীর গতিধারা থেমে থাকছে না, তেমনি যারা চলে যাচ্ছেন তাদের স্মৃতি ধারণ করে কেউ আজীবন বসেও থাকছে না। তদুপরি এই অগণিত মানুষের ভেতর এমনও কিছু ব্যক্তিত্ব থাকেন যাদেরকে মানুষ ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারে না । তাঁরা আপন কীর্তি ও স্মৃতিতে থাকেন চিরঞ্জীব ও চির অম্লান, তেমনি এক ক্ষণজন্মা হলেন মুন্সী রহমত উল্লাহ সাহেব।
রহমত উল্লাহ সাহেবের শ্রদ্ধাভাজন পিতার নাম ছিল বরকত উল্লাহ । পিতা পুত্রের নামের মধ্যেই যেন ছিল শান্তির বার্তা, বরকতের ঔরসজাত থেকে জন্ম নিল রহমত। তাঁদের পেশা ছিল তালুকদারি ।

উপাধীঃ
মুন্সী হচ্ছে বাঙ্গালী মুসলমানদের প্রাচীন একটি উপাধি। যারা ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হতেন যাদের মধ্যে পরেজগারি থাকতো তাদেরকে মুন্সী নামে ডেকে সম্মান করা হতো, অধিকন্তু তিনি মুন্সী নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন ।

জন্মঃ
আজ থেকে অনেক বছর পূর্বে সিলেট জেলার অন্তর্গত বিশ্বনাথ থানার অলংকারী ইউনিয়নের আদর্শ সুবৃহৎ গ্রাম শিমুল তলার তালুকদার বংশের ঐতিহ্যবাহী এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আল্লাহর অশেষ বরকত ও রহমত নিয়ে শিমুল তলায় বর্তমান যুগের দুর্লভ ঐক্যের প্রতীক রেখে যেতে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর জন্ম সন সম্পর্কে নিকট আত্মীয় ও এলাকার মুরব্বীদের কাছ থেকে জানা যায় তিনি ১৮৪০ ইংরেজীতে কোন এক শুভক্ষণে জন্মগ্রহণ করেন।

সন্তানাদিঃ
তিনি ১৮জন পুত্র ও ১ জন মেয়ে সন্তানের জনক ছিলেন , সকল সন্তানই একই সহধর্মিনীর গর্ভজাত ছিলেন । কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ,তাঁর ১৭ জন পুত্র অল্প বয়সে স্বাভাবিক ভাবেই মৃত্যু বরণ করেন, আদরের সন্তানদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিলেন একজন ।

গুণাবলীঃ
মুন্সী রহমত উল্লাহ সাহেব একজন খোদাভিরু ,পরহেজগার লোক ছিলেন তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য জানা না থাকলেও তিনি যে একজন আধ্যাত্মিক গুণ সম্পন্ন আল্লাহ্ প্রেমিক লোক ছিলেন এতে করো কোন সন্দেহ নেই। তিনি গ্রামের খুবই গণ্যমান্য ধনী পরিবারের লোক ছিলেন, তাঁর উদারতা, দানশীলতা, উত্তম গুণাবলী, সামাজিক অবদান সমুহ সর্বক্ষেত্রে প্রশংসাযোগ্য । গ্রামের মানুষের জন্য তাঁর অবদান সকলকে মুগ্ধ করে রেখেছে ।

এককালে বৃহত্তর সিলেটের গ্রামাঞ্চলে বর্ষাকালে নৌকা বাইচের প্রচলন ছিল, বিরাট লম্বা আকৃতির নকশা খচীত নৌকা তৈরি করে বাদ্য যন্ত্র সহ সারি গানের তালে তালে নেচে নেচে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হতো, ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সেই নৌকা বাইচে নেতৃত্ব দান করে তাঁরই বংশ ধারার শেষ সম্বল পুত্র সন্তানটি, যখন তিনি শুনলেন মাগরিবের পূর্ব মূহুর্তে তাঁর ছেলের মুখে আযান ধ্বনির পরিবর্তে “রহমাত উল্লাহর ভানগা নৌকা নে উড়াইয়া নে” বাদ্য যন্ত্রের তালে তালে গানের ধ্বনি তখন তিনি দারুনভাবে মর্মাহত হয়ে আল্লাহর দরবারে বদদোয়া করে বলে বসলেন “হে আমার রব !! তুমিতো আমার ১৭ জন পুত্র সন্তানকে তোমার নিকট নিয়ে গেছো, তাহলে আমার মুখে কালিমালেপনকারীকে রেখে কি লাভ” । আল্লাহর কি মানসা কিছু দিনের মধ্যেই তাঁর বংশের শেষ বাতিটিকেও আল্লাহ নিয়ে যান। পরবর্তীতে রহমাত উল্লার একমাত্র কন্যা সন্তানের মাধ্যমেই তাঁর বংশধারা
এ পর্যন্ত জারি আছে । তাঁর উক্ত কন্যা সন্তানের উত্তরসূরিরা বর্তমানে এলাকায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হসপিটাল প্রতিষ্ঠা সহ সাড়া জাগানো সামাজিক উন্নয়নের কাজ আন্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।

সকল ছেলে সন্তানকে হারিয়ে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বৃহত্তর গ্রামবাসীর জন্য একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নিজ জায়গার উপর যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে নিজ হস্তে একটি মসজিদ নির্মাণ করে গিয়ে সকলের নিকট পিতৃতুল্য সন্মানের
আসনে রয়ে গেলেন। আজ পর্যন্ত গ্রামের সকল মানুষ যোগ যোগ ধরে ঐক্যবদ্ধভাবে ঐক্যের প্রতীক এ মসজিদেই একত্রে নামাজ আদায় করে আসছেন। আল্লাহ যেন এ মহান ধারাকে জারি রাখেন ।

তিনি ভবিষ্যত বিবেচনায় মসজিদের যাবতীয় খরচ বহনের জন্য প্রায় ৫ কেদার জায়গাও মসজিদের নামে ওয়াকফ করে দিয়ে যান।
তাঁর দানকৃত ২২ শতক জায়গার উপর প্রথম মসজিদটি নিজ হাতে স্থাপন করেন ১৮৯৭ সালে চুনা ছোরকি ও গম্বুজ আকৃতির দ্বারা। মুসল্লী বেড়ে যাওয়ায় গ্রামবাসীর উদ্যোগে প্রথম পুনঃনির্মাণ করা হয় ১৯৭৬ সালে দু তালা ছাদ ঢালায়ির মাধ্যমে এবং সর্বশেষ পুনঃনির্মাণ করা হয় ২০০১ সালে যার দৃষ্টিনন্দন বর্তমান রুপ এখন আমাদের সামনে। বর্তমানে মসজিদের নামে দান কৃত জায়গা আছে পৌনে সাত কেদার এর মধ্যে পৌনে পাঁচ কেদার জায়গা রহমত উল্লাহ সাহেবের দেওয়া ।
বর্তমান যুগের তোলনায় পূর্বেকার যুগে মাদ্রাসার সংখ্যা তেমন ছিল না, মসজিদ ভিত্তিক মক্তবের মাধ্যমেই মাদ্রাসা শিক্ষার ধারা চালু ছিল উক্ত মাসজিদটি সে ধারা আজও চালিয়ে যাচ্ছে ।

মসজিদের পাশেই তাঁর বাড়ী, আদিকাল থেকেই তাঁর বাড়ীর নাম মুল্লাবাড়ী। সেই বাড়ীর ক্বারী আ: রাজ্জাক সাহেব মসজিদের ইমাম হিসাবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করে গেছেন । এর পর ঐ বাড়ির আয়োজনে তাদের আত্বীয় প্রতিবেশী গ্রাম শেখের গাঁওর বড় মৌলভী শাইখ আব্দুল লতিফ ( দা বা) দীর্ঘদিন যাবৎ খতিবের দায়িত্ব আনজাম দেন । মসজিদের মুতাওয়াল্লী হিসেবে নির্ধারণ করা হতো মুন্সী রহমত উল্লাহ সাহেবের আত্মীয় স্বজন থেকে। এ ধারা অব্যাহত ছিল আসিম উল্লাহ, মেরাব উল্লাহ এবং আবদুল খালিক পর্যন্ত । কালের বিবর্তনে ও প্রয়োজনে উভয়টি পরিবর্তন হয়ে তাঁর আত্বীয় স্বজন ‌ও গ্রামবাসীর সমন্বয়ে গঠিত কমিটির দ্বারা চলছে, যে কমিটিতে তাঁর উত্তরসুরীর পক্ষে আব্দুল খালিক ট্রেজারার হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন । এ বাড়িরই আলকাছ আলী সুদীর্ঘদিন মাসজিদের সেবা ও মুয়াজ্জিনের মহান দায়িত্ব আনজাম দিয়ে এখন বার্ধক্যের কারণে অবসরে আছেন । আলহামদুলিল্লাহ, গ্রামবাসীও ঐ বাড়িকে মূল্যায়ন করে আসছেন । বর্তমানে তাঁর আত্মীয়-স্বজন এর মধ্যে যারা আছেন তারা সবাই তাঁরই ওপর তিন ভাই ইজ্জত উল্লাহ, ইনায়েত উল্লাহ ও কালিম উল্লাহর উত্তরসূরী ।

তিনি আজ পৃথিবীতে বেঁচে নেই , কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি আল্লাহর ঘর মসজিদটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম স্মরণ রাখবে।
আমরা আশা রাখি তিনি নবীজী(সা.) এর হাদীসের উপর আমল করায় আল্লাহ্ তা’য়ালা তাঁকে জান্নাতে একটি উত্তম ঘর দান করবেন।
হযরত উসমান ইবনু আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত । তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ নির্মাণ করবে আল্লাহ্ তাঁর জন্য জান্নাতে অনুরূপ ঘর নির্মাণ করবেন “।

মৃত্যুঃ
তিনি কত সালে ইন্তেকাল করেছেন তা নিশ্চিত না হলেও, যতদূর জানা যায় তিনি ১৯১০ ইংরেজী সনে ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে তাঁর নির্মিত মাসজিদের পাশে তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে পিতা মাতা ও ইতিহাস স্রিষ্টিকারী তাঁর ১৮ ছেলে সন্তানের পাশে সমাহিত করা হয় যেখান থেকে তিনি নৌকা বাইচ এর গানের সুর এর পরিবর্তে মুয়াজ্জিনের সুমধুর কন্ঠে আজানের ধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন, এবং আল্লাহ যেন এ ধ্বনি কিয়ামত পর্যন্ত তাঁকে শুনাতে থাকেন । তাঁর সুপ্ত মনের বাসনা ” মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই, কবর থেকে যেন আমি মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই” আল্লাহতা’য়ালা যেন তাঁর বান্দার এ আকুতিকে খাছ রহম দিয়ে পূরণ করে দিয়েছেন ।

পরিশেষে লেখক তাঁর মরহুম দাদা মুজেফর আলীর আপন নানা মহান ব্যক্তিত মুন্সি রহমত উল্লাহ ( র:) র জন্য সকলের পক্ষ থেকে মহান মালিকের কাছে আকুতি জানান, তিনি যেন তাঁর এ প্রিয় বান্দাকে জান্নাতের ‘ আলা মাকাম দান করেন । আমীন

লেখক:
মুন্সী রহমত উল্লাহ সাহেবের একমাত্র মেয়ে পক্ষের সুযোগ্য উত্তরসূরী বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, রাম সুন্দর হাই স্কুল এর সুনাম ধন্য সিনিয়র শিক্ষক, আন্-নি’য়ামাহ উইমেন্স এডুকেশন ট্রাস্ট ইউ,কে, জামেয়া ইসলামিয়া হাজী আঃছাত্তার মহিলা মাদ্রাসা ও জুলেখা মাদারিছুল উম্মাহাত শিমুল তলা, বিশ্বনাথ, সিলেট এর ফাউন্ডার ও প্রধান খাদিম এবং দি ওয়ান পাউন্ড হসপিটাল বিশ্বনাথের মেম্বার অফ পলিসি কাউন্সিল
এম আবুল হাশেম ( বি-এস সি)

ট্যাগস

নৌকা বাইচের অপরাধে পিতার বদ’দোয়া অবশেষে ১৮তম পুত্রের মৃত্যু!

আপডেট সময় ০৫:১৪:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১

অজানা ইতিহাস
এম আবুল হাশেম বিএসসি
________________________

ভূমিকাঃ

এ পৃথিবীতে কত মানুষ আসে আবার চলে যায়, কে কার খোঁজ রাখে। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যারা চলে গেলে ও তাঁদেরকে ভুলা যায় না। তাঁদের স্মৃতি কর্মজীবন ও অবদান ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকে।
পৃথিবীর বুকে মানুষের আগমন ও প্রস্তান তথা জীবন-মরণ অনস্বীকার্য একটি বিষয়, এটা জগতের চিরন্তন ধারা, কোটি কোটি মানুষ জন্ম নিচ্ছে তেমনি পৃথিবী থেকে বিদায়ও গ্রহণ করছে এতে যেমন পৃথিবীর গতিধারা থেমে থাকছে না, তেমনি যারা চলে যাচ্ছেন তাদের স্মৃতি ধারণ করে কেউ আজীবন বসেও থাকছে না। তদুপরি এই অগণিত মানুষের ভেতর এমনও কিছু ব্যক্তিত্ব থাকেন যাদেরকে মানুষ ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারে না । তাঁরা আপন কীর্তি ও স্মৃতিতে থাকেন চিরঞ্জীব ও চির অম্লান, তেমনি এক ক্ষণজন্মা হলেন মুন্সী রহমত উল্লাহ সাহেব।
রহমত উল্লাহ সাহেবের শ্রদ্ধাভাজন পিতার নাম ছিল বরকত উল্লাহ । পিতা পুত্রের নামের মধ্যেই যেন ছিল শান্তির বার্তা, বরকতের ঔরসজাত থেকে জন্ম নিল রহমত। তাঁদের পেশা ছিল তালুকদারি ।

উপাধীঃ
মুন্সী হচ্ছে বাঙ্গালী মুসলমানদের প্রাচীন একটি উপাধি। যারা ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হতেন যাদের মধ্যে পরেজগারি থাকতো তাদেরকে মুন্সী নামে ডেকে সম্মান করা হতো, অধিকন্তু তিনি মুন্সী নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন ।

জন্মঃ
আজ থেকে অনেক বছর পূর্বে সিলেট জেলার অন্তর্গত বিশ্বনাথ থানার অলংকারী ইউনিয়নের আদর্শ সুবৃহৎ গ্রাম শিমুল তলার তালুকদার বংশের ঐতিহ্যবাহী এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আল্লাহর অশেষ বরকত ও রহমত নিয়ে শিমুল তলায় বর্তমান যুগের দুর্লভ ঐক্যের প্রতীক রেখে যেতে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর জন্ম সন সম্পর্কে নিকট আত্মীয় ও এলাকার মুরব্বীদের কাছ থেকে জানা যায় তিনি ১৮৪০ ইংরেজীতে কোন এক শুভক্ষণে জন্মগ্রহণ করেন।

সন্তানাদিঃ
তিনি ১৮জন পুত্র ও ১ জন মেয়ে সন্তানের জনক ছিলেন , সকল সন্তানই একই সহধর্মিনীর গর্ভজাত ছিলেন । কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ,তাঁর ১৭ জন পুত্র অল্প বয়সে স্বাভাবিক ভাবেই মৃত্যু বরণ করেন, আদরের সন্তানদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিলেন একজন ।

গুণাবলীঃ
মুন্সী রহমত উল্লাহ সাহেব একজন খোদাভিরু ,পরহেজগার লোক ছিলেন তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য জানা না থাকলেও তিনি যে একজন আধ্যাত্মিক গুণ সম্পন্ন আল্লাহ্ প্রেমিক লোক ছিলেন এতে করো কোন সন্দেহ নেই। তিনি গ্রামের খুবই গণ্যমান্য ধনী পরিবারের লোক ছিলেন, তাঁর উদারতা, দানশীলতা, উত্তম গুণাবলী, সামাজিক অবদান সমুহ সর্বক্ষেত্রে প্রশংসাযোগ্য । গ্রামের মানুষের জন্য তাঁর অবদান সকলকে মুগ্ধ করে রেখেছে ।

এককালে বৃহত্তর সিলেটের গ্রামাঞ্চলে বর্ষাকালে নৌকা বাইচের প্রচলন ছিল, বিরাট লম্বা আকৃতির নকশা খচীত নৌকা তৈরি করে বাদ্য যন্ত্র সহ সারি গানের তালে তালে নেচে নেচে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হতো, ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সেই নৌকা বাইচে নেতৃত্ব দান করে তাঁরই বংশ ধারার শেষ সম্বল পুত্র সন্তানটি, যখন তিনি শুনলেন মাগরিবের পূর্ব মূহুর্তে তাঁর ছেলের মুখে আযান ধ্বনির পরিবর্তে “রহমাত উল্লাহর ভানগা নৌকা নে উড়াইয়া নে” বাদ্য যন্ত্রের তালে তালে গানের ধ্বনি তখন তিনি দারুনভাবে মর্মাহত হয়ে আল্লাহর দরবারে বদদোয়া করে বলে বসলেন “হে আমার রব !! তুমিতো আমার ১৭ জন পুত্র সন্তানকে তোমার নিকট নিয়ে গেছো, তাহলে আমার মুখে কালিমালেপনকারীকে রেখে কি লাভ” । আল্লাহর কি মানসা কিছু দিনের মধ্যেই তাঁর বংশের শেষ বাতিটিকেও আল্লাহ নিয়ে যান। পরবর্তীতে রহমাত উল্লার একমাত্র কন্যা সন্তানের মাধ্যমেই তাঁর বংশধারা
এ পর্যন্ত জারি আছে । তাঁর উক্ত কন্যা সন্তানের উত্তরসূরিরা বর্তমানে এলাকায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হসপিটাল প্রতিষ্ঠা সহ সাড়া জাগানো সামাজিক উন্নয়নের কাজ আন্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।

সকল ছেলে সন্তানকে হারিয়ে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বৃহত্তর গ্রামবাসীর জন্য একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নিজ জায়গার উপর যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে নিজ হস্তে একটি মসজিদ নির্মাণ করে গিয়ে সকলের নিকট পিতৃতুল্য সন্মানের
আসনে রয়ে গেলেন। আজ পর্যন্ত গ্রামের সকল মানুষ যোগ যোগ ধরে ঐক্যবদ্ধভাবে ঐক্যের প্রতীক এ মসজিদেই একত্রে নামাজ আদায় করে আসছেন। আল্লাহ যেন এ মহান ধারাকে জারি রাখেন ।

তিনি ভবিষ্যত বিবেচনায় মসজিদের যাবতীয় খরচ বহনের জন্য প্রায় ৫ কেদার জায়গাও মসজিদের নামে ওয়াকফ করে দিয়ে যান।
তাঁর দানকৃত ২২ শতক জায়গার উপর প্রথম মসজিদটি নিজ হাতে স্থাপন করেন ১৮৯৭ সালে চুনা ছোরকি ও গম্বুজ আকৃতির দ্বারা। মুসল্লী বেড়ে যাওয়ায় গ্রামবাসীর উদ্যোগে প্রথম পুনঃনির্মাণ করা হয় ১৯৭৬ সালে দু তালা ছাদ ঢালায়ির মাধ্যমে এবং সর্বশেষ পুনঃনির্মাণ করা হয় ২০০১ সালে যার দৃষ্টিনন্দন বর্তমান রুপ এখন আমাদের সামনে। বর্তমানে মসজিদের নামে দান কৃত জায়গা আছে পৌনে সাত কেদার এর মধ্যে পৌনে পাঁচ কেদার জায়গা রহমত উল্লাহ সাহেবের দেওয়া ।
বর্তমান যুগের তোলনায় পূর্বেকার যুগে মাদ্রাসার সংখ্যা তেমন ছিল না, মসজিদ ভিত্তিক মক্তবের মাধ্যমেই মাদ্রাসা শিক্ষার ধারা চালু ছিল উক্ত মাসজিদটি সে ধারা আজও চালিয়ে যাচ্ছে ।

মসজিদের পাশেই তাঁর বাড়ী, আদিকাল থেকেই তাঁর বাড়ীর নাম মুল্লাবাড়ী। সেই বাড়ীর ক্বারী আ: রাজ্জাক সাহেব মসজিদের ইমাম হিসাবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করে গেছেন । এর পর ঐ বাড়ির আয়োজনে তাদের আত্বীয় প্রতিবেশী গ্রাম শেখের গাঁওর বড় মৌলভী শাইখ আব্দুল লতিফ ( দা বা) দীর্ঘদিন যাবৎ খতিবের দায়িত্ব আনজাম দেন । মসজিদের মুতাওয়াল্লী হিসেবে নির্ধারণ করা হতো মুন্সী রহমত উল্লাহ সাহেবের আত্মীয় স্বজন থেকে। এ ধারা অব্যাহত ছিল আসিম উল্লাহ, মেরাব উল্লাহ এবং আবদুল খালিক পর্যন্ত । কালের বিবর্তনে ও প্রয়োজনে উভয়টি পরিবর্তন হয়ে তাঁর আত্বীয় স্বজন ‌ও গ্রামবাসীর সমন্বয়ে গঠিত কমিটির দ্বারা চলছে, যে কমিটিতে তাঁর উত্তরসুরীর পক্ষে আব্দুল খালিক ট্রেজারার হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন । এ বাড়িরই আলকাছ আলী সুদীর্ঘদিন মাসজিদের সেবা ও মুয়াজ্জিনের মহান দায়িত্ব আনজাম দিয়ে এখন বার্ধক্যের কারণে অবসরে আছেন । আলহামদুলিল্লাহ, গ্রামবাসীও ঐ বাড়িকে মূল্যায়ন করে আসছেন । বর্তমানে তাঁর আত্মীয়-স্বজন এর মধ্যে যারা আছেন তারা সবাই তাঁরই ওপর তিন ভাই ইজ্জত উল্লাহ, ইনায়েত উল্লাহ ও কালিম উল্লাহর উত্তরসূরী ।

তিনি আজ পৃথিবীতে বেঁচে নেই , কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি আল্লাহর ঘর মসজিদটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম স্মরণ রাখবে।
আমরা আশা রাখি তিনি নবীজী(সা.) এর হাদীসের উপর আমল করায় আল্লাহ্ তা’য়ালা তাঁকে জান্নাতে একটি উত্তম ঘর দান করবেন।
হযরত উসমান ইবনু আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত । তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ নির্মাণ করবে আল্লাহ্ তাঁর জন্য জান্নাতে অনুরূপ ঘর নির্মাণ করবেন “।

মৃত্যুঃ
তিনি কত সালে ইন্তেকাল করেছেন তা নিশ্চিত না হলেও, যতদূর জানা যায় তিনি ১৯১০ ইংরেজী সনে ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে তাঁর নির্মিত মাসজিদের পাশে তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে পিতা মাতা ও ইতিহাস স্রিষ্টিকারী তাঁর ১৮ ছেলে সন্তানের পাশে সমাহিত করা হয় যেখান থেকে তিনি নৌকা বাইচ এর গানের সুর এর পরিবর্তে মুয়াজ্জিনের সুমধুর কন্ঠে আজানের ধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন, এবং আল্লাহ যেন এ ধ্বনি কিয়ামত পর্যন্ত তাঁকে শুনাতে থাকেন । তাঁর সুপ্ত মনের বাসনা ” মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই, কবর থেকে যেন আমি মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই” আল্লাহতা’য়ালা যেন তাঁর বান্দার এ আকুতিকে খাছ রহম দিয়ে পূরণ করে দিয়েছেন ।

পরিশেষে লেখক তাঁর মরহুম দাদা মুজেফর আলীর আপন নানা মহান ব্যক্তিত মুন্সি রহমত উল্লাহ ( র:) র জন্য সকলের পক্ষ থেকে মহান মালিকের কাছে আকুতি জানান, তিনি যেন তাঁর এ প্রিয় বান্দাকে জান্নাতের ‘ আলা মাকাম দান করেন । আমীন

লেখক:
মুন্সী রহমত উল্লাহ সাহেবের একমাত্র মেয়ে পক্ষের সুযোগ্য উত্তরসূরী বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, রাম সুন্দর হাই স্কুল এর সুনাম ধন্য সিনিয়র শিক্ষক, আন্-নি’য়ামাহ উইমেন্স এডুকেশন ট্রাস্ট ইউ,কে, জামেয়া ইসলামিয়া হাজী আঃছাত্তার মহিলা মাদ্রাসা ও জুলেখা মাদারিছুল উম্মাহাত শিমুল তলা, বিশ্বনাথ, সিলেট এর ফাউন্ডার ও প্রধান খাদিম এবং দি ওয়ান পাউন্ড হসপিটাল বিশ্বনাথের মেম্বার অফ পলিসি কাউন্সিল
এম আবুল হাশেম ( বি-এস সি)