ঢাকা ০৬:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ধর্ষন, আইন আর মানবাধিকার।

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি লেখা ছাপা হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে। লেখাটির শিরোনাম ‘পত্রিকা পড়ার গল্প’। পত্রিকা কিভাবে একটি পরিবার থেকে আরম্ভ করে রাষ্ট্রের পরিচালনায় ভূমিকা রাখে তার সাবলীল উপস্থাপনা প্রধানমন্ত্রীর স্বভাবসুলভ লেখনীটিতে।

সঙ্গত কারণেই গত কয়েকটি মাসে বিশ্বের আর সব জায়গার মত আমাদের পত্রিকাগুলোর শিরোনাম ছিল কোভিডের দখলে। একই চিত্র অন্যান্য মিডিয়ায়ও। আমাদের আজকের জীবনাচার, ব্যক্তিগত থেকে রাষ্ট্রীয়, সবকিছুর নিয়ামক যখন কোভিড, এমনটা না হওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক। আর গত কয়েকদিনে দেশের মিডিয়ায় আমরা সেই অস্বাভাবিকতাটাই দেখলাম। কোভিডকে পাশে সরিয়ে শিরোনামে ছিল অন্য ঘটনা। ঘটনা না বলে বরং বলা উচিত ঘটনাশৃঙ্খল।

একটি-দু’টি নয়, একরে পর এক। ঘটনাও না- দুর্ঘটনা বা তার চেয়েও ভয়ানক কিছু। কোভিডকে আমরা আর শিরোনামে চাই না, তবে এরচেয়ে কোভিডও ভাল। মানুষ এমন করতে পারে না, পারে না এতটা নিচে নামতে। অবলা শিশু, গৃহবধূ, বিধবা কিংবা বৃদ্ধা, কেউই আর নিরাপদ নয়। না শহরে, না গ্রামে, না প্রত্যন্ত জনপদে। অবাক হয়ে দেখছি, ধর্ষকের সাথে তোলা হাস্যোজ্জ্বল সেলফি স্যোশাল মিডিয়ায়। মানুষের রুচি, মনুষ্যত্ব সব কি হারিয়ে গেল? বিবেক আর মানবিকতা খুঁজতে কি ঘাটতে হবে ডিকশনারির পাতা?

প্রশ্নটা দাঁড়াচ্ছে শেষ কোথায়? প্রচলিত আইনের সংস্কারের দাবি উঠেছে। আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন সহসাই ঘটতে যাচ্ছে তা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যও অভিন্ন। আমার আস্থা আছে তাতে। কারণ চোখের সামনেই তো দেখছি গ্রেফতার হচ্ছে একের পর এক ধর্ষক দেশের একেক প্রান্ত থেকে। এতবেশি ধর্ষণ, ধর্ষক আর গ্রেফতার যে হিসাব মেলানোই দায়।

আমি বিশ্বাস করতে চাই সিস্টেমে, বিশ্বাস রাখি সরকারে। কিন্তু বিচার আসলেই হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় আমারও। বিচারহীনতায় নয়, পুলিশ দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন কিংবা প্রশাসন উদাসীন তাও না। জানি আসবে না রাজনৈতিক চাপও। তারপরও বিচার নিয়ে সংশয়ে আমি। বিচার হয়তো হবে না কারণ বিচারের প্রক্রিয়াটাই এমন। শাস্তি দিতে প্রমাণ চাই, চাই সাক্ষী। ধর্ষণের সময় সাক্ষী থাকে না, থাকে ধর্ষিতা আর ধর্ষক। আর থাকে আলামত, যা নষ্ট হয় অনায়াসে। ঘটনা জানা যায় ফেসবুকের কল্যাণে। সাক্ষী দিতে আসেন না প্রতিবেশী। আসবেন কিভাবে? তাদের ঘরেও যে অবলা শিশু কিংবা বৃদ্ধা মা। প্রচলিত আইনে তাই নিরাপদে ধর্ষক, অনিরাপদ ধর্ষিতা আর ধর্ষিতার আত্বীয়-প্রতিবেশী।

নির্মম এই বাস্তবতায় মাথাকুড়ে মরে বিপন্ন মানবতা। আমরা কি এতটাই অসহায়? এই আমরাই না ক’বছর আগে থামিয়ে দিলাম আগুন সন্ত্রাস, গুঁড়িয়ে দিলাম সাকা’র দম্ভ! অথচ কোথাকার কোন দেলোয়ারের কাছে অসহায় গোটা জাতি। শুধু ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইনের সংশোধনই কি সমাধান? একদমই না। খোলনালচে বদলে ফেলতে হবে সাক্ষী আর সাক্ষ্যের বিধানও। এই রক্ষণশীল, চোখবুজে থাকা সমাজের চোখ রাঙানির পরোয়া না করে যখন কোন নারী প্রকাশ্যে এসে জানায় যে সে ধর্ষিতা, তখন কিসের সাক্ষী? কিসের সাক্ষ্য? বন্ধুপ্রতিম সাংবাদিক জ. ই. মামুন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিপক্ষে, কিন্তু বেগমগঞ্জের জানোয়ারদের জন্য ক্রসফায়ার ছাড়া অন্য কোন শাস্তি তার মাথায় আসছে না। আমি শুধু জানি মানবাধিকার মানুষের প্রাপ্য। প্রাপ্য পশুরও। আমি জাপানের যে এহিমে বিশ্ববিদ্যালয় ভিজিটিং অধ্যাপক হিসাবে সংযুক্ত আছি সেখানে বছরের একটি দিন ল্যাবের গবেষণায় যেসব প্রাণি প্রাণ দেয় তাদের স্মরণ করা হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। পশুর প্রতি পাশবিকতার বদলে মানবিকতাই এখন সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু তাই বলে ধর্ষকের জন্যও? ধর্ষকের আবার কিসের মানবাধিকার? এরা মানুষতো না-ই, পশুও না। ধর্ষকের জন্য কেউ যদি মানবাধিকারের কথা বলে ২০২০-এর এই ধোঁয়াচ্ছন্ন সময়গুলোকে আরো ধোঁয়াশা করতে চায়, তবে কথা দিচ্ছি আমার সামান্য লেখনীর যতটুকু জোর সবটুকু উজাড় করে দিব তার বিরুদ্ধে।

লেখকঃ মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল।            চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

ট্যাগস

ধর্ষন, আইন আর মানবাধিকার।

আপডেট সময় ০২:০৪:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২০

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি লেখা ছাপা হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে। লেখাটির শিরোনাম ‘পত্রিকা পড়ার গল্প’। পত্রিকা কিভাবে একটি পরিবার থেকে আরম্ভ করে রাষ্ট্রের পরিচালনায় ভূমিকা রাখে তার সাবলীল উপস্থাপনা প্রধানমন্ত্রীর স্বভাবসুলভ লেখনীটিতে।

সঙ্গত কারণেই গত কয়েকটি মাসে বিশ্বের আর সব জায়গার মত আমাদের পত্রিকাগুলোর শিরোনাম ছিল কোভিডের দখলে। একই চিত্র অন্যান্য মিডিয়ায়ও। আমাদের আজকের জীবনাচার, ব্যক্তিগত থেকে রাষ্ট্রীয়, সবকিছুর নিয়ামক যখন কোভিড, এমনটা না হওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক। আর গত কয়েকদিনে দেশের মিডিয়ায় আমরা সেই অস্বাভাবিকতাটাই দেখলাম। কোভিডকে পাশে সরিয়ে শিরোনামে ছিল অন্য ঘটনা। ঘটনা না বলে বরং বলা উচিত ঘটনাশৃঙ্খল।

একটি-দু’টি নয়, একরে পর এক। ঘটনাও না- দুর্ঘটনা বা তার চেয়েও ভয়ানক কিছু। কোভিডকে আমরা আর শিরোনামে চাই না, তবে এরচেয়ে কোভিডও ভাল। মানুষ এমন করতে পারে না, পারে না এতটা নিচে নামতে। অবলা শিশু, গৃহবধূ, বিধবা কিংবা বৃদ্ধা, কেউই আর নিরাপদ নয়। না শহরে, না গ্রামে, না প্রত্যন্ত জনপদে। অবাক হয়ে দেখছি, ধর্ষকের সাথে তোলা হাস্যোজ্জ্বল সেলফি স্যোশাল মিডিয়ায়। মানুষের রুচি, মনুষ্যত্ব সব কি হারিয়ে গেল? বিবেক আর মানবিকতা খুঁজতে কি ঘাটতে হবে ডিকশনারির পাতা?

প্রশ্নটা দাঁড়াচ্ছে শেষ কোথায়? প্রচলিত আইনের সংস্কারের দাবি উঠেছে। আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন সহসাই ঘটতে যাচ্ছে তা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যও অভিন্ন। আমার আস্থা আছে তাতে। কারণ চোখের সামনেই তো দেখছি গ্রেফতার হচ্ছে একের পর এক ধর্ষক দেশের একেক প্রান্ত থেকে। এতবেশি ধর্ষণ, ধর্ষক আর গ্রেফতার যে হিসাব মেলানোই দায়।

আমি বিশ্বাস করতে চাই সিস্টেমে, বিশ্বাস রাখি সরকারে। কিন্তু বিচার আসলেই হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় আমারও। বিচারহীনতায় নয়, পুলিশ দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন কিংবা প্রশাসন উদাসীন তাও না। জানি আসবে না রাজনৈতিক চাপও। তারপরও বিচার নিয়ে সংশয়ে আমি। বিচার হয়তো হবে না কারণ বিচারের প্রক্রিয়াটাই এমন। শাস্তি দিতে প্রমাণ চাই, চাই সাক্ষী। ধর্ষণের সময় সাক্ষী থাকে না, থাকে ধর্ষিতা আর ধর্ষক। আর থাকে আলামত, যা নষ্ট হয় অনায়াসে। ঘটনা জানা যায় ফেসবুকের কল্যাণে। সাক্ষী দিতে আসেন না প্রতিবেশী। আসবেন কিভাবে? তাদের ঘরেও যে অবলা শিশু কিংবা বৃদ্ধা মা। প্রচলিত আইনে তাই নিরাপদে ধর্ষক, অনিরাপদ ধর্ষিতা আর ধর্ষিতার আত্বীয়-প্রতিবেশী।

নির্মম এই বাস্তবতায় মাথাকুড়ে মরে বিপন্ন মানবতা। আমরা কি এতটাই অসহায়? এই আমরাই না ক’বছর আগে থামিয়ে দিলাম আগুন সন্ত্রাস, গুঁড়িয়ে দিলাম সাকা’র দম্ভ! অথচ কোথাকার কোন দেলোয়ারের কাছে অসহায় গোটা জাতি। শুধু ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইনের সংশোধনই কি সমাধান? একদমই না। খোলনালচে বদলে ফেলতে হবে সাক্ষী আর সাক্ষ্যের বিধানও। এই রক্ষণশীল, চোখবুজে থাকা সমাজের চোখ রাঙানির পরোয়া না করে যখন কোন নারী প্রকাশ্যে এসে জানায় যে সে ধর্ষিতা, তখন কিসের সাক্ষী? কিসের সাক্ষ্য? বন্ধুপ্রতিম সাংবাদিক জ. ই. মামুন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিপক্ষে, কিন্তু বেগমগঞ্জের জানোয়ারদের জন্য ক্রসফায়ার ছাড়া অন্য কোন শাস্তি তার মাথায় আসছে না। আমি শুধু জানি মানবাধিকার মানুষের প্রাপ্য। প্রাপ্য পশুরও। আমি জাপানের যে এহিমে বিশ্ববিদ্যালয় ভিজিটিং অধ্যাপক হিসাবে সংযুক্ত আছি সেখানে বছরের একটি দিন ল্যাবের গবেষণায় যেসব প্রাণি প্রাণ দেয় তাদের স্মরণ করা হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। পশুর প্রতি পাশবিকতার বদলে মানবিকতাই এখন সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু তাই বলে ধর্ষকের জন্যও? ধর্ষকের আবার কিসের মানবাধিকার? এরা মানুষতো না-ই, পশুও না। ধর্ষকের জন্য কেউ যদি মানবাধিকারের কথা বলে ২০২০-এর এই ধোঁয়াচ্ছন্ন সময়গুলোকে আরো ধোঁয়াশা করতে চায়, তবে কথা দিচ্ছি আমার সামান্য লেখনীর যতটুকু জোর সবটুকু উজাড় করে দিব তার বিরুদ্ধে।

লেখকঃ মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল।            চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।